শেয়ার করুন

|

ইসরাত জাহান

শওকত ওসমানের দুই সৈনিক: একাত্তরের ইতিহাসের নির্মম প্রতিচ্ছবি

প্রকাশ:

২৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪২

শেয়ার করুন

|

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা সাহিত্যে বিশ্বাসঘাতক চরিত্রগুলো সাধারণত পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই উঠে এসেছে। কিন্তু কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান তাঁর উপন্যাস দুই সৈনিক (১৯৭৩)-এ এই ঘৃণ্য চরিত্রকেই কেন্দ্রে এনে নির্মাণ করেছেন এক তীব্র বাস্তবতা ও ট্র্যাজেডির গল্প। এখানে শুধু যুদ্ধের নির্মমতা নয়, উন্মোচিত হয়েছে দালালচক্রের মানসিকতা এবং তাদের পরিণতির নির্মম হিসাব।

উপন্যাসটির কাহিনি বিস্তৃত নয়, বরং সময়ের দিক থেকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মাত্র এক বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘটনার ভেতর দিয়ে একটি পরিবারের ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরেছেন লেখক। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই যে ভয়াবহতা নির্মিত হয়, তা পুরো মুক্তিযুদ্ধের এক প্রতীকী চিত্র হয়ে ওঠে।

কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে মখদুম মৃধা- একজন সুযোগসন্ধানী দ্বিমুখী চরিত্র। বাহ্যিকভাবে ধর্মপরায়ণ, শান্ত স্বভাবের মানুষ মনে হলেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর স্বার্থপরতা। একসময় মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই ব্যক্তি যুদ্ধের সময় নিজের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে। আবার পরিস্থিতি বুঝে বাংলাদেশপন্থীদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। অর্থাৎ, সে একেবারেই সুবিধাবাদী- দুই কূল রক্ষায় ব্যস্ত।

এই চরিত্রের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো- সে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে।

যুদ্ধকালীন একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই অফিসার- মেজর হাকিম ও ক্যাপ্টেন ফৈয়াজ- গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মখদুম মৃধা তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। তোষামোদে মত্ত হয়ে সে তাদের আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি রাখে না। তার দুই মেয়ে সাহেলী ও চামেলীও বাবার সম্মান রক্ষায় আন্তরিকভাবে রান্নাবান্না করে অতিথিদের সেবা করে।

কিন্তু এই আপ্যায়নই হয়ে ওঠে সর্বনাশের সূত্রপাত।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাতাল হয়ে ওঠে পাকিস্তানি অফিসাররা। তাদের আচরণ ক্রমেই অশালীন ও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা মখদুম মৃধার দুই মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়- যা আসলে ছিল জোরপূর্বক দখলের ইঙ্গিত। মৃধা আপত্তি জানালে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়, ঘর লুট করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তার দুই মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়- এটি ১৯৭১ সালের বর্বরতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

উপন্যাসে সাহেলী ও চামেলী চরিত্র দুটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তারা শিক্ষিত, সচেতন এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা বুঝতে পারে এবং অন্তরে বাংলাদেশপন্থী চেতনা ধারণ করে। কিন্তু তাদের সেই সচেতনতা বা নির্দোষিতা কোনোভাবেই তাদের রক্ষা করতে পারে না। বরং বাবার ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হতে হয় তাদেরই।

এখানেই উপন্যাসটির সবচেয়ে নির্মম সত্য উন্মোচিত হয়- দালালের অপরাধের শাস্তি অনেক সময় নিরীহদের ওপর নেমে আসে।

মখদুম মৃধার চরিত্রে লেখক দেখিয়েছেন এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব। বাইরে ধর্মীয় ভাষণ, ভেতরে স্বার্থপরতা; মুখে পাকিস্তান রক্ষার কথা, আবার গোপনে অন্যপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ- এই দ্বিচারিতা শেষ পর্যন্ত তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তার আত্মহত্যা যেন কেবল ব্যক্তিগত পরিণতি নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক প্রতীক- যে বিশ্বাসঘাতকতা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই গ্রাস করে।

দুই সৈনিক উপন্যাসে পাকিস্তানি দুই অফিসার কেবল চরিত্র নয়, বরং ২৫ মার্চের গণহত্যা-পরবর্তী দখলদার বাহিনীর প্রতীক। তাদের বর্বরতা, লোভ এবং মানবিকতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি পুরো জাতির ওপর চালানো নিপীড়নেরই প্রতিফলন।

এই উপন্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধ শুধু সম্মুখযুদ্ধ ছিল না, ছিল নৈতিকতারও পরীক্ষা। কে কোন পাশে দাঁড়াবে, সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করেছে তার ইতিহাসে অবস্থান। দুই সৈনিক একটি গভীর বার্তা দিয়ে যায়- স্বার্থের কাছে নত হওয়া মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের বিচার ডেকে আনে। কিন্তু সেই বিচারের আগুনে পুড়ে যায় অনেক নির্দোষ জীবনও।

এই সাইটটি সুরক্ষা দেয় reCAPTCHA ও Google এর গোপনীয়তা নীতি এবং নীতিমালা প্রযোজ্য।

শেয়ার

নিয়ে আরও পড়ুন

শেয়ার করুন

কপি করুন

কপি করুন