শেয়ার করুন

|

মাসনুন মোর্শেদ

তাঁদের নিয়ে টি-২০ একাদশ, যাঁরা কখনো টি-টোয়েন্টিই খেলেননি

প্রকাশ:

১৬ মার্চ ২০২৬, ১৮:২৮

শেয়ার করুন

|

ক্রিকেট ইতিহাসে এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যারা আধুনিক টি-টোয়েন্টি যুগ শুরু হওয়ার আগেই অবসর নিয়েছেন। অথচ তাদের খেলার ধরন, আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কিংবা ম্যাচে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা বিবেচনা করলে সহজেই বোঝা যায়—আজকের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও তারা সমানভাবে কার্যকর হতে পারতেন। তেমনই কিছু তারকাকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে একটি কাল্পনিক টি-টোয়েন্টি একাদশ, যেখানে স্থান পেয়েছেন বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা।

ওপেনার — সাইদ আনোয়ার — পাকিস্তান
সাঈদ আনোয়ারকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম মারকুটে এবং নান্দনিক বাঁহাতি ওপেনার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে অফ-সাইডের অন্যতম সেরা ব্যাটার মনে করা হয়। কবজির মোচড়ে কাভার এবং পয়েন্ট অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গ্যাপ খুঁজে বের করায় তিনি ছিলেন ওস্তাদ। অনেক আধুনিক ওপেনারের মতো তার পায়ের কাজ খুব বেশি ছিল না; বরং অসাধারণ হ্যান্ড-আই কোঅর্ডিনেশন এবং টাইমিংয়ের ওপর নির্ভর করে তিনি বোলারদের শাসন করতেন। ইনিংসের শুরু থেকেই বোলারদের ওপর চড়াও হওয়া ছিল তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। ১৯৯৭ সালে চেন্নাইয়ে ভারতের বিপক্ষে তার রেকর্ডব্রেকিং ১৯৪ রানের ইনিংসে তিনি অনিল কুম্বলেকে টানা তিনটি ছক্কা মেরেছিলেন। ভারতের বিপক্ষে করা ১৯৪ রানের ইনিংসটি প্রায় ১৩ বছর পর্যন্ত ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল। ওয়ানডে ক্রিকেটে পাকিস্তানের হয়ে তিনি ২০টি সেঞ্চুরি করেছেন, যা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দেশটির পক্ষে সর্বোচ্চ ছিল। তিনি ১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০৩—তিনটি বিশ্বকাপেই পাকিস্তানের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। সাঈদ আনোয়ারের ব্যাটিং ছিল গতির সাথে নান্দনিকতার এক অপূর্ব মিশ্রণ।

ওপেনার — মার্ক ওয়াহ — অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি মার্ক ওয়াহ, যাকে তার মার্জিত ব্যাটিং শৈলীর কারণে ‘দ্য মোজার্ট অফ দ্য উইলো’ বলা হয়, নব্বইয়ের দশকের অন্যতম প্রতিভাবান ক্রিকেটার ছিলেন। মার্ক ওয়াহর ব্যাটিং ছিল চোখের প্রশান্তি। খুব বেশি শক্তি প্রয়োগ না করে কেবল কবজির মোচড় এবং টাইমিংয়ের ওপর নির্ভর করে তিনি অবলীলায় বাউন্ডারি মারতেন। তাকে তার সময়ের সেরা লেগ-সাইড ব্যাটারদের একজন মনে করা হতো। কাট এবং ড্রাইভ শটে তার দক্ষতা ছিল প্রবাদপ্রতিম। ওয়ানডে ক্রিকেটে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের সাথে তার ওপেনিং জুটি ছিল ধ্বংসাত্মক। তাকে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্লিপ ফিল্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। অবসরের সময় টেস্টে অ-উইকেটকিপার হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্যাচের (১৮১টি) বিশ্ব রেকর্ডটি তারই ছিল। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি মিডিয়াম পেস বোলিং করতেন, কিন্তু পিঠের ইনজুরির কারণে পরবর্তীতে অফ-স্পিনারে পরিণত হন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ব্রেক-থ্রু এনে দিতে তিনি ছিলেন পটু। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে তিনি প্রথম ব্যাটার হিসেবে এক আসরে ৩টি সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। মার্ক ওয়াহ কেবল রানের সংখ্যার জন্য নয়, বরং তার খেলার ধরণ এবং শৈল্পিকতার জন্য ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

৩ — ব্রায়ান লারা — ওয়েস্ট ইন্ডিজ
সিরিজের অন্যতম সেরা এই ব্যাটার সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই আসে তার উচ্চ ব্যাকলিফট এবং নান্দনিক ব্যাটিং শৈলী। ব্রায়ান লারা ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি একাই প্রতিপক্ষের যেকোনো বোলিং আক্রমণকে তছনছ করে দিতে পারতেন। স্পিনারদের বিপক্ষে লারার পা ছিল জাদুর মতো। শেন ওয়ার্ন বা মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো কিংবদন্তিদের বিপক্ষেও তিনি অবলীলায় ডাউন দ্য উইকেটে এসে বড় শট খেলতেন। লারা ছিলেন ‘ম্যারাথন’ ইনিংস খেলার কারিগর। তার কবজির মোচড় এবং টাইমিং এতই নিখুঁত ছিল যে, মাঠের যেকোনো কোণ দিয়ে তিনি বাউন্ডারি বের করতে পারতেন। ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা তার এই ৪০০* রানের ইনিংসটি আজও টেস্ট ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোরের বিশ্ব রেকর্ড। ১৯৯৪ সালে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে তিনি ৫০১* রান করেন, যা প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে একমাত্র ৫০০ ঊর্ধ্ব ইনিংস। এক ওভারে ২৮ রান: ২০০৩ সালে আর জে পিটারসনের এক ওভারে তিনি ২৮ রান নিয়েছিলেন, যা দীর্ঘ সময় টেস্টের বিশ্ব রেকর্ড ছিল। ব্রায়ান লারা ছিলেন এমন একজন ব্যাটার যাকে আউট করা ছিল বোলারদের জন্য লটারি জেতার মতো। তার ব্যাটিং তেজ এবং শৈল্পিকতা যেকোনো টি-টোয়েন্টি দলের মিডল অর্ডারকে শক্তিশালী করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

৪ — ভিভ রিচার্ডস — ওয়েস্ট ইন্ডিজ
স্যার ভিভ রিচার্ডস হলেন ক্রিকেটের ইতিহাসের প্রথম প্রকৃত টি-টোয়েন্টি ব্যাটার, যিনি এই ফরম্যাটটি আসার দুই দশক আগেই তার আক্রমণাত্মক খেলা দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তাকে ক্রিকেটের সবচেয়ে ভীতিকর এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যাটার হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বিশ্বের দ্রুতগতির বোলারদের বিপক্ষে কখনো হেলমেট পরতেন না। তার সেই চুইংগাম চিবানো এবং বোলারদের চোখের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞা করার ভঙ্গিটি ছিল তার ট্রেডমার্ক। যখন ওয়ানডে ক্রিকেটে ৬০-৭০ স্ট্রাইক রেটকে আদর্শ ধরা হতো, তখন ভিভ রিচার্ডস খেলতেন ৯০-এর ওপর স্ট্রাইক রেটে। তার ব্যাটিং ছিল পাওয়ার এবং টাইমিংয়ের এক অনন্য মিশ্রণ। অফ-সাইড হিটিং তিনি যেকোনো লেংথের বলকে অবলীলায় মিড-উইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠাতে পারতেন। শাফলিং করে অফ-স্টাম্পের বাইরের বলকে লেগ-সাইডে মারা ছিল তার বিশেষত্ব। ১৯৮৪ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অপরাজিত ১৮৯ রানের ইনিংসটি ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা। দল যখন ১০২ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন তিনি এই দানবীয় ইনিংস খেলেছিলেন। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৫৬ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি, যা ৩০ বছর পর্যন্ত টেস্টের দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড ছিল। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৫০টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কখনোই কোনো সিরিজ হারেননি। ভিভ রিচার্ডস কেবল একজন ব্যাটার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘ম্যাচ উইনার’।

৫ — জন্টি রোডস — দক্ষিণ আফ্রিকা
যেকোনো টি-টোয়েন্টি একাদশের জন্য জন্টি রোডস এক অনিবার্য নাম। তাকে ক্রিকেটের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফিল্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। জন্টি রোডস ফিল্ডিংকে কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি শক্তিশালী ‘অস্ত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সাধারণত ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ফিল্ডিং করতেন। তার ক্ষিপ্রতা এবং বাতাসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ধরার ক্ষমতা ব্যাটারদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করত। পাকিস্তানের ইনজামাম-উল-হককে আউট করার জন্য তার সেই উড়ন্ত রান-আউটটি ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক মুহূর্তগুলোর একটি। ১৯৯৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ওয়ানডে ম্যাচে তিনি ফিল্ডার হিসেবে ৫টি ক্যাচ নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন। জন্টি রোডস ছিলেন অত্যন্ত চটপটে ব্যাটার। তিনি গ্যাপ খুঁজে বের করে দ্রুত ১-২ রান নিতে ওস্তাদ ছিলেন। তিনি রিভার্স সুইপ এবং প্যাডেল সুইপের মতো উদ্ভাবনী শট খেলতে পছন্দ করতেন, যা তৎকালীন যুগে বিরল ছিল। তার উপস্থিতি মানেই ছিল প্রতিপক্ষের অন্তত ১৫-২০ রান বাঁচিয়ে দেওয়া। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ বলতে যা বোঝায়, জন্টি রোডস ছিলেন তার সার্থক রূপকার।

৬ — কপিল দেব — ভারত
কপিল দেব ছিলেন ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার এবং ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক। তাকে ‘হরিয়ানা হারিকেন’ নামে ডাকা হয় কারণ তার বোলিং এবং ব্যাটিং উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরণের বিধ্বংসী তেজ ছিল। কপিল দেবের প্রধান অস্ত্র ছিল তার বিষাক্ত আউটসুইং। ডানহাতি ব্যাটারদের জন্য তার বলগুলো সাধারণত বাইরের দিকে বেরিয়ে যেত, যা সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। তার বোলিং অ্যাকশন ছিল অত্যন্ত মসৃণ এবং ছন্দময়, যা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে টানা বোলিং করার সক্ষমতা দিত। তিনি ছিলেন প্রাকৃতিকভাবেই একজন হার্ড-হিটিং ব্যাটার। বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যুগে থাকলে তিনি নিশ্চিতভাবেই অন্যতম সেরা ফিনিশার হতেন। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার বিখ্যাত ১৭৫* রানের ইনিংসটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওয়ানডে ইনিংস। ভারত যখন ১৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন তিনি এসে ১৩৮ বলে ১৬টি চার ও ৬টি ছক্কার সাহায্যে এই মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ৫,০০০-এর বেশি রান এবং ৪০০-এর বেশি উইকেট (৪৩৪টি) নিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে অবসরের সময় তিনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন। ২০১০ সালে তাকে সম্মানজনক আইসিসি হল অফ ফেম-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কপিল দেব কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণা, যার হাত ধরে ভারত বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।

৭ — ল্যান্স ক্লুজনার — দক্ষিণ আফ্রিকা
ল্যান্স ক্লুজনারকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম বিধ্বংসী অলরাউন্ডার এবং ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা ‘ফিনিশার’দের একজন মনে করা হয়। তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে ‘জুলু’ নামেও ডাকা হয়। ক্লুজনার তার বিশাল ব্যাকলিফট এবং পেশীবহুল শক্তির সাহায্যে বোলারদের শাসন করতেন। বিশেষ করে স্লগ ওভারে তার ‘বেসবল স্টাইল’ ব্যাটিং তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনি ৮ ইনিংসে ১৪০.৫০ গড়ে ২৮১ রান করেছিলেন, যার স্ট্রাইক রেট ছিল ১২২.১৭। তিনি ৪টি ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ সহ ‘প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট’ নির্বাচিত হন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি একজন গতিশীল ফাস্ট বোলার থাকলেও পরে মিডিয়াম পেস বোলিংয়ে মনোযোগী হন। নিখুঁত ইনসুইং ইয়র্কার এবং স্লোয়ার অফ-কাটারে তিনি দক্ষ ছিলেন। ১৯৯৬ সালে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই মাত্র ৬৪ রানে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন, যা আজও এক ইনিংসে কোনো দক্ষিণ আফ্রিকান অভিষিক্ত বোলারর সেরা রেকর্ড।

৮ — মঈন খান — পাকিস্তান
নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রাণভোমরা ছিলেন মঈন খান। উইকেটরক্ষক হিসেবে তার ক্ষিপ্রতা এবং চাপের মুখে কার্যকর ব্যাটিং তাকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের জন্য একজন আদর্শ ‘ইউটিলিটি প্লেয়ার’ হিসেবে প্রমাণ করে। মঈন খান প্রথাগত ব্যাটিংয়ের চেয়ে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে শট খেলতেন। তার দ্রুত পায়ের কাজ এবং উদ্ভাবনী শট খেলার ক্ষমতা ওয়ানডে ক্রিকেটে তাকে অত্যন্ত কার্যকর করে তুলেছিল। তাকে প্রায়ই পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময় ত্রাতা হিসেবে দেখা যেত। লেজের সারির ব্যাটারদের নিয়ে লড়াই করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার, যা টি-টোয়েন্টির ফিনিশারদের অন্যতম প্রধান গুণ। কিংবদন্তি স্পিনার সাকলাইন মুশতাকের রহস্যময় ডেলিভারিটির নামকরণ মঈন খানই করেছিলেন, যা ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ইনিংসে ৩টি স্টাম্পিং করার যৌথ বিশ্বরেকর্ড তার দখলে রয়েছে। তিনি ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তান দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। বিশেষ করে সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে তার দ্রুতগতিতে করা রান পাকিস্তানকে ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে। মঈন খানের লড়াকু মানসিকতা এবং খেলার ধরণ তাকে যেকোনো টি-টোয়েন্টি একাদশের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য উইকেটরক্ষক-ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

৯ — ওয়াসিম আকরাম (অধিনায়ক) — পাকিস্তান
এই দলের অধিনায়ক হলেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বাঁহাতি ফাস্ট বোলার ওয়াসিম আকরাম। তার জাদুকরী সুইং এবং গতির কারণে তাকে ‘সুলতান অফ সুইং’ বা ‘সুইংয়ের রাজা’ বলা হয়। তিনি নতুন বলে ইনসুইং ও আউটসুইং এবং পুরোনো বলে রিভার্স সুইং—উভয় ক্ষেত্রেই ছিলেন সমান পারদর্শী। রিভার্স সুইংয়ের অন্যতম উদ্ভাবক এবং সার্থক রূপকার হিসেবে তাকে মানা হয়। ডেথ ওভারে তার বিষাক্ত ইনসুইং ইয়ার্কার এবং হঠাৎ ধেয়ে আসা বাউন্সার বিশ্বের যেকোনো ব্যাটারের জন্য ছিল এক দুঃস্বপ্ন। তার বোলিং অ্যাকশন ছিল অত্যন্ত ক্ষিপ্র, যার ফলে ব্যাটাররা বল ডেলিভারি হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বুঝতে পারতেন না বল কোন দিকে সুইং করবে। তিনি কেবল বোলার ছিলেন না, নিচের দিকে একজন মারকুটে ব্যাটারও ছিলেন। টেস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার ২৫৭ রানের অপরাজিত ইনিংসটি আজও ৮ নম্বর পজিশনে ব্যাট করা কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ স্কোর। এক টেস্ট ইনিংসে সর্বোচ্চ ১২টি ছক্কা মারার রেকর্ডও তার দখলে। ফাইনালে ব্যাট হাতে ৩৩ রান এবং বল হাতে ইংল্যান্ডের অ্যালান ল্যাম্ব ও ক্রিস লুইসকে টানা দুই বলে আউট করে পাকিস্তানের শিরোপা জয়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে তিনি প্রথম বোলার হিসেবে ৩০০, ৪০০ ও ৫০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন। তিনি টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় ফরম্যাটে ২টি করে মোট ৪টি হ্যাটট্রিক করেছেন, যা একটি অনন্য রেকর্ড। তার সাথে ওয়াকার ইউনিসের বিখ্যাত ‘টু ডব্লিউ’ জুটি ব্যাটসম্যানদের মনে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল। এই জুটি একসাথে ৬১টি টেস্টে মোট ৫৫৯টি এবং ১৯৮টি ওডিআই ম্যাচে মোট ৫২১টি উইকেট শিকার করেছে। ওয়াসিম আকরাম কেবল একজন বোলার নন, বরং ফাস্ট বোলিংয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

১০ — আব্দুল কাদির — পাকিস্তান
আব্দুল কাদিরকে আধুনিক লেগ স্পিন বোলিংয়ের পুনর্জন্মদাতা এবং একজন সত্যিকারের ‘জাদুকর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সত্তর ও আশির দশকে যখন ফাস্ট বোলারদের দাপটে লেগ স্পিন হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন তিনি তার বৈচিত্র্যময় বোলিং দিয়ে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তার বোলিং অ্যাকশন ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও থিয়েট্রিকাল। বল ছোঁড়ার আগে তার সেই ছন্দময় হাঁটা এবং লাফিয়ে ওঠার ভঙ্গি ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাকে বলা হতো ‘ছয় ডেলিভারির মাস্টার’। তার ঝুলিতে ছিল প্রথাগত লেগ-ব্রেক, টপ স্পিনার, ফ্লিপার এবং অন্তত দুই ধরনের গুগলি। তিনি একই বল দশ ভিন্ন উপায়ে করতে পারতেন বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি কেবল রান আটকানোর জন্য নয়, বরং উইকেট নেওয়ার জন্য বল করতেন। তার ফ্লাইট এবং স্পিন ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করত। ১৯৮৭ সালে লাহোরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি ৫৬ রানে ৯ উইকেট শিকার করেন, যা আজও টেস্টের এক ইনিংসে কোনো পাকিস্তানি বোলারের সেরা সাফল্য। আব্দুল কাদির কেবল একজন বোলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন লেগ স্পিন শিল্পের একজন ধারক ও বাহক, যার প্রভাব আজও বিশ্ব ক্রিকেটে বিদ্যমান।

১১ — কার্টলি অ্যামব্রোস — ওয়েস্ট ইন্ডিজ
স্যার কার্টলি অ্যামব্রোস ছিলেন নব্বইয়ের দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেস আক্রমণের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ভীতিকর ফাস্ট বোলারদের একজন। তাকে প্রায়ই ‘সাইলেন্ট অ্যাসাসিন’ বলা হয়, কারণ তিনি মাঠে কথা কম বললেও তার বোলিং ছিল প্রচণ্ড আগ্রাসী। ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি লম্বা এই বোলারের ডেলিভারি পয়েন্ট ছিল অনেক উপরে, যার ফলে তিনি যেকোনো উইকেটে অস্বাভাবিক বাউন্স তৈরি করতে পারতেন। তার বাউন্স সামলানো ব্যাটারদের জন্য ছিল এক দুঃস্বপ্ন। কেবল গতি নয়, অ্যামব্রোস তার অবিশ্বাস্য নির্ভুলতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই লেংথে বল করে ব্যাটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন। বাউন্সের পাশাপাশি তিনি বলকে দুই দিকেই সুইং এবং সিম করাতে পারতেন, যা তাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছিল। আধুনিক টি-টোয়েন্টির যুগেও তার ইকোনমি রেট যেকোনো বোলারের জন্য ঈর্ষণীয় হতো। টেস্টে ২.৩০ এবং ওয়ানডেতে ৩.৪৮ ইকোনমি রেট তার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের প্রমাণ দেয়। ১৯৯৩ সালে পার্থে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৩২ বলের একটি স্পেলে তিনি ১ রান দিয়ে ৭টি উইকেট নিয়েছিলেন, যা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী স্পেল হিসেবে বিবেচিত। ২০১১ সালে তাকে আইসিসি হল অফ ফেম-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ২০১৪ সালে ক্রিকেটে অবদানের জন্য তিনি নাইট উপাধি পান। অ্যামব্রোস এবং কোর্টনি ওয়ালশের বোলিং জুটি ছিল ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা, যারা একত্রে ৪৯টি টেস্টে ৪২১টি উইকেট নিয়েছিলেন।

দ্বাদশ খেলোয়াড় — এন্ডি ফ্লাওয়ার — জিম্বাবুয়ে
নন্দিত জিম্বাবুয়েন ক্রিকেটার অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা উইকেটরক্ষক-ব্যাটার এবং স্পিন বোলিং খেলার অন্যতম সেরা কারিগর হিসেবে গণ্য করা হয়। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সোনালী সময়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। উপমহাদেশের টার্নিং পিচে স্পিনারদের শাসন করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তার। বিশেষ করে তার রিভার্স সুইপ খেলার দক্ষতা তাকে সমসাময়িকদের থেকে আলাদা করেছিল, যা বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য অপরিহার্য একটি শট। মিডল অর্ডারে এক প্রান্ত আগলে রাখা এবং দ্রুত রান তোলায় তিনি ছিলেন দক্ষ। তার লড়াকু মানসিকতার কারণে তাকে ‘জিম্বাবুয়ের প্রাচীর’ বলা হতো। স্টাম্পের পেছনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ এবং নির্ভরযোগ্য, যা তাকে দলের জন্য একজন পূর্ণাঙ্গ ‘প্যাকেজ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়েতে ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’র প্রতিবাদে তিনি কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে নেমেছিলেন, যা তার সাহসিকতার পরিচয় দেয়। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের ব্যাটিং গড় (৫১.৫৪) যেকোনো উইকেটরক্ষকের জন্য সর্বকালের সেরাদের একটি।

এই সাইটটি সুরক্ষা দেয় reCAPTCHA ও Google এর গোপনীয়তা নীতি এবং নীতিমালা প্রযোজ্য।

শেয়ার

নিয়ে আরও পড়ুন

শেয়ার করুন

কপি করুন

কপি করুন