গ্রীসে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন আর পূরণ হলো না সুনামগঞ্জের ছয় যুবকের। লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তাদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার পর এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নেমে আসে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
জানা গেছে, মোট ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায়। নিহতরা হলেন—দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তারেক মিয়া (২৩) এবং দোয়ারা উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফাহিম আহমদ (অভ্র ফাহিম)।
ফাহিম আহমদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিলন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, লিবিয়া থেকে ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী একটি নৌকায় করে গ্রীসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। বড় জাহাজে নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের একটি ছোট হাওয়াই বোটে তোলা হয়। যাত্রীদের মধ্যে ৫ জন সুদানের নাগরিক এবং বাকি ৩৮ জন ছিলেন বাংলাদেশি।
দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসতে ভাসতে খাদ্য ও পানির সংকটে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা। এক পর্যায়ে অন্তত ২২ জন মারা যান। মরদেহগুলো প্রথমে নৌকাতেই রাখা হলেও দুই দিন পর পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়ালে সেগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, ভয়াবহ এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে বেঁচে যাওয়া এক যুবক পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন।
অন্যদিকে, শুক্রবার ভোরে গ্রীসের ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী ও এক শিশুসহ ২৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে। গ্রিস কোস্টগার্ড জানায়, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানী এবং ১ জন চাঁদের নাগরিক রয়েছেন।
নিহত সাহান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া জানান, প্রতিজন প্রায় ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে বিদেশে পাড়ি জমান। প্রথমে ঢাকা থেকে সৌদি আরব, এরপর মিশর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয় তাদের। লিবিয়ায় পৌঁছে চুক্তির অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়। এরপর কয়েকদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। তবে এখনো পর্যন্ত কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটনাটি জানা গেছে। নিহতদের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় দিরাইসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শোকের মাতম বিরাজ করছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।