গবেষণা কার্যক্রম আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে সম্মানজনক কাজগুলোর একটি। উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা ছাড়াও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সময়েও সবাইকে কম-বেশি গবেষণা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকতে হয়। দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য। তবে তার আগে জেনে নেওয়া প্রয়োজন, গবেষক আর গবেষণা নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত।
অ্যাকাডেমিক জগতে গবেষক সেই ব্যক্তি, যিনি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মৌলিক তত্ত্ব নির্মাণ কিংবা অনুদ্ঘাটিত তথ্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে পথচলা শুরু করেন। জ্ঞানচর্চার এই দীর্ঘ ও পরিশ্রমসাধ্য যাত্রায় গবেষক কেবল তথ্য সংগ্রহকারী নন, বরং তিনি সত্য অনুসন্ধানের একনিষ্ঠ অভিযাত্রী।
গবেষকদের বিভিন্নভাবে শ্রেণিভুক্ত করা যায়। সাধারণভাবে তাঁদের দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়- অধীন গবেষক ও স্বাধীন গবেষক।
অধীন গবেষক
যাঁরা কোনো তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন, তাঁরা অধীন গবেষক হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের গবেষণায় তত্ত্বাবধায়ক ও গবেষকের সম্পর্ক মূলত সহযোগিতামূলক হওয়া প্রয়োজন।
গবেষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে মতপার্থক্য হলেও তা সংযম ও যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করা। তত্ত্বাবধায়কের কোনো আচরণ বা মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হলেও আবেগপ্রবণ না হয়ে গবেষণার কাজে মনোযোগী থাকা উচিত। অনেক সময় তত্ত্বাবধায়ক গবেষকের ভুল সংশোধন করে দেন- এটিকে নিজের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অধীন গবেষকের জন্য এই সম্পর্কটি একদিকে যেমন দিকনির্দেশনার উৎস, তেমনি অন্যদিকে আত্মউন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
স্বাধীন গবেষক
স্বাধীন গবেষকদের কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক থাকে না; তাঁরা নিজস্ব চিন্তা ও উদ্যোগে গবেষণার কাজ পরিচালনা করেন। এই স্বাধীনতার মধ্যে যেমন সৃজনশীলতার সুযোগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও।
তত্ত্বাবধায়কের অনুপস্থিতিতে গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে তাঁদের অনেক সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধান, গবেষণার মান যাচাই কিংবা দিকনির্দেশনা—সবই নিজের প্রচেষ্টায় সম্পন্ন করতে হয়। কখনও কখনও আত্মমর্যাদাবোধ বা মানসিক জটিলতাও কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এর বিপরীতে স্বাধীন গবেষকরা তাঁদের কাজে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেও অনেকেই মৌলিক ও মূল্যবান গবেষণা সম্পন্ন করে থাকেন। জ্ঞানের ভিত্তি সুদৃঢ় হলে এবং গবেষণার প্রতি আন্তরিকতা থাকলে স্বাধীন গবেষণার মূল্য কোনো অংশে কম নয়।
গবেষণার প্রকৃতি অনুযায়ী গবেষকদের আরও তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়- তত্ত্বান্বেষী, তথ্যান্বেষী এবং উভয়ান্বেষী গবেষক।
তত্ত্বান্বেষী গবেষক
যাঁদের গবেষণার মূল লক্ষ্য নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, তাঁরা তত্ত্বান্বেষী গবেষক। জ্ঞানতত্ত্বের বিকাশে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যান্বেষী গবেষক
যাঁরা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনকে গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁরা তথ্যান্বেষী গবেষক। বাস্তবভিত্তিক গবেষণায় তাঁদের অবদান বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
উভয়ান্বেষী গবেষক
যে গবেষক তত্ত্ব ও তথ্য- উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন, তাঁরা উভয়ান্বেষী গবেষক। এ ধরনের গবেষণা সাধারণত অধিক পরিপূর্ণ ও সমন্বিত হয়ে থাকে।
গবেষণার দর্শন ও দায়বোধ
গবেষণা কেবল একটি পেশা নয়; এটি এক ধরনের সাধনা। গবেষকের জন্য গবেষণা নয়, বরং গবেষণার জন্যই গবেষক- এই বোধটি অন্তরে ধারণ করা জরুরি।
অন্তর্নিহিত এই দায়বোধ ও নিষ্ঠাই গবেষককে নানা বাধা-বিঘ্ন, সংশয় ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে নিয়ে যায়। জ্ঞান অনুসন্ধানের এই মহৎ অভিযাত্রায় সেই অন্তর্গত প্রেরণাই গবেষকের তরণীকে স্থিরভাবে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়।