সমাজ ভাষাবিজ্ঞান হচ্ছে ভাষাবিজ্ঞানের সে শাখা, যে শাখায় সমাজ ও ভাষার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নিরূপণ করা হয়। ভাষাবিজ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটি মূলত মানুষের সামাজিক জীবন ও ভাষার ব্যবহারের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। বেঁচে থাকার তাগিদে, জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে কিংবা মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে মত বিনিময় অত্যন্ত জরুরি। আর এই মত বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। সুতরাং, সমাজবদ্ধ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ভাষা অপরিহার্য। এই ভাষা যতটা না জন্মগত, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক সংস্থার ফসল।
সামাজিক মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে বিচিত্র ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। ভাষার ওপর নির্ভর করেই সমাজে বসবাসকারী মানুষের জীবনধারা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো এবং তার মান নির্ধারণ করা সম্ভব। একজন মানুষ বিভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে—এটাই স্বাভাবিক। যেমন, একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী অফিসে যে ভাষায় কথা বলেন, পরিবারের সঙ্গে তিনি অন্য ভাষা ব্যবহার করেন। আবার নিজ গ্রাম বা মফস্বলে গেলে সেই পরিবেশ অনুযায়ী ভাষা পরিবর্তন করেন। এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট হয়, মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান তার ভাষা ব্যবহারের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
সমাজ ও ভাষা- দুটিই পরিবর্তনশীল। প্রতিনিয়ত এদের পরিবর্তন ঘটে। মানব সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে রয়েছে মানুষের চিন্তা ও মননশীলতা, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো পারস্পরিক যোগাযোগ, আর তার মাধ্যম ভাষা। সাধারণত ভাষার পরিবর্তন ঘটে দুইভাবে।
১) সচেতনভাবে
২) অসচেতনভাবে
সমাজ ও ভাষার পরিবর্তন সরল বা চক্রাকার নয়; বরং এতে পুনরাবৃত্তি যেমন থাকে, তেমনি সংশোধন ও পরিমার্জনও ঘটে। সমাজ ও ভাষা একে অপরের ভারসাম্য রক্ষা করে, আবার কখনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাধাও সৃষ্টি করে। অর্থাৎ সমাজের গতিশীলতা ও ভাষার পরিবর্তনশীলতা পরস্পরের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
সমাজগঠন, সংরক্ষণ ও বিকাশ- এসব বিষয়ই সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। সমাজ ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক প্রেক্ষাপট ছাড়া ভাষাবিজ্ঞানের পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন সম্ভব নয়। একই সমাজে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রভাব ভাষার ওপর গভীর ছাপ ফেলে। প্রাচীন যুগের মানুষের ভাষা ও আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ভাষার মধ্যে পার্থক্য এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
মানুষ, সমাজ এবং ভাষা- এই তিনটি ধারণার ওপরই সমাজ ভাষাবিজ্ঞানের প্রভাব বিদ্যমান। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে গোত্র, এবং পরবর্তীতে জাতি ও রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় ভাষা একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে। সমাজ হলো ব্যক্তির সমষ্টি, আর ভাষা হলো সেই সমাজের সম্পদ। ভাষা না জানলে একজন মানুষ সামাজিক ও মানবিক সত্তা হিসেবে পূর্ণতা পায় না।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘ভাষা ও রাষ্ট্র’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আধুনিক বিশ্বে ‘nation’ বা জাতির ভিত্তি অনুসন্ধান করতে গেলে ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু জাতি বসবাস করলেও ইংরেজি ভাষা তাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। আবার অস্ট্রিয়ার নিজস্ব ভাষা না থাকায় তারা জার্মান ভাষাকে গ্রহণ করেছে। অস্ট্রিয়ার কবি রিলকে কিংবা সুইজারল্যান্ডের কবি স্পেটেলা জার্মান ভাষায় সাহিত্য রচনা করে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট হয়- মানুষ রাষ্ট্র বা সমাজ ছাড়া কোনোভাবে টিকে থাকতে পারলেও ভাষা ছাড়া তার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।